Blog

রোড এক্সিডেন্ট ! মৃত্যুর ফাঁদ

জনসংখ্যা ও বহুমাত্রিক যানবাহন বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি হলেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেনি। শুধুমাত্র ২০১৮ সালে এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৭১ জন মানুষ নিহত হয়েছেন,পঙ্গু হয়েছেন কয়েক ৭০০০ জনেরও বেশী। কারো পা নেই, কারো হাত নেই, একটা পরিবারের প্রধান অর্থ উপার্জনকারী যখন পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে থাকে তখন সেই পরিবারের ধ্বংস হওয়াটা নিজ চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। কেন এতো দুর্ঘটনা ? আর সব দুর্ঘটনা শুধু সড়কে কেন ? কারা দায়ী এই দুর্ঘটনার জন্য ? সময় হয়েছে ভেবে দেখার ।।

আমাদের দেশে ৮০% মানুষই মধ্যবিত্ত সীমার নিচে বসবাস করেন। জীবিকার তাগিদে কেউ বিজনেস, কেউ বা চাকুরী করেন। প্রতিদিন সকাল বেলা আমরা সবাই বাসা থেকে বের হই নিজ কর্মস্থলে যাবো বলে। উদ্দেশ্য পরিবারের জন্য উপার্জন করা, যে পরিবার কে আমরা সবথেকে বেশী ভালবাসি। সারাদিন যতই কঠিন পরিশ্রম করি না কেন, রাতে বাসায় ফিরে যখন নিজ পরিবারের মানুষ গুলোকে কাছে পাই তখন সব কষ্ট ভুলে যাই। সারাদিন কাজের জন্য বা বিজনেস এর কাজে পুরো শহর দৌড়ে বেরাতে হয়। কখনও বাস এ কখনও ট্রেন এ, কখনও রিক্সায় ছুটে চলি রাস্তার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনও পায়ে হেঁটে ছুটে চলতে হয় দুরুত্ব বুজে। সারাদিন মাথায় ঘুরতে থাকে নানান চিন্তা চেতনা আর স্বপ্ন। কখনও বা হিসাব মেলাতে মেলাতে বাস এর শক্ত হাতলটা ধরে ঝুলতে ঝুলতে অফিস এ বা কাজে যাই। সব পরিশ্রম আর চিন্তা কিন্তু ওই পরিবারের জন্য যাদের হাসিমাখা মুখ দেখে সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। মাঝে মাঝে এতটাই বেখেয়ালি হয়ে যাই যে, কি করছি বা কি করা অচিত সেটা ভুলে যাই। জীবনের গতির সাথে পরিবারের খরচ এর গতি মেলাতে পারি না। তখন খুজি কোন শর্টকার্ট রাস্তা আছে কিনা আরও বাড়তি কিছু আয় করার! নিজের শক্তি আর সময় এর গতি বাড়াতে থাকি আরেকটু বেশী আয় করার জন্য। এই গতি বাড়াতে এতোটাই বেস্ত থাকি যে, দুর্ঘটনা বলে একটা শব্দ আছে সেটা ভুলে যাই। যখন জীবন, সময় আর আমাদের চারপাশে থাকা সব চলমান বস্তুগুলুর গতি কম বেশী হয়, ঠিক তখনি ঘটে দুর্ঘটনা।

আজ বাংলার মানুষ সব রাস্তার দুর্ঘটনার জন্য বৃহত্তর পরিবহন সেক্টরকে দোষারোপ করে। এটা ঠিক বলে ধরে নিলাম। কিন্তু যারা বাস বা ট্রাক চালায় তারাও কিন্ত ওই পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, সপ্ন পুরুনের জন্য, একটু বাড়তি আয়ের জন্য শর্টকার্ট রাস্তাটাই বেছে নেয়। সময়ের গতি বাড়িয়ে দেয় আর ঘটে দুর্ঘটনা। নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে অন্য পরিবারের মুখের হাসি কেড়ে নেয়।

একটি দৈনিক পত্রিকায় দেখিছিলাম শুধু রমজানের ঈদের যাত্রা থেকে শুরু করে ফিরে আসা পর্যন্ত মোট ১৩ দিনের মধ্যে সারা বাংলাদেশে ২১১ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৮ জন নিহত হয়েছে এবং ৭১৭ আহত হয়েছে । আমরা সবাই জানি যে, বাস ও ট্রাক সহ ভারী যানবাহন চালকদের অবহেলা এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার জন্য পুলিশের নজরদারির অভাব, ছোট গাড়ি বৃদ্ধি, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং পথচারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাবকে দায়ী করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সাধারন মানুষ গুলিও এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হয়। বিশেষ করে যারা শর্টকার্ট রাস্তায় আয় বাড়াতে চান। শর্টকার্ট পথে কেউ সফল হতে পারে না। আজ আমাদের সবাইকেই সচেতন হতে হবে দুর্ঘটনার ব্যাপারে। আরও অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে বিশেষ করে যতক্ষণ রাস্তায় থাকবেন। বাসায় না ফেরা পর্যন্ত আমরা কেউই নিরাপদ না।  রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বিমানবন্দর রোডে নির্মমভাবে নিহত হয় ওই শর্টকার্ট পথে টাকা আয় করতে যাওয়া ২ ড্রাইভার এর জন্য। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিয়েছিল শুধু বাড়তি টাকা আয় করার জন্য। নিজেরাও ধ্বংস হয়ে গেছে আর সাথে নিজেদের পরিবার এবং ওই ২ পরিবার কেও ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।   এই দুর্ঘটনা শুধু ওদের পরিবারকেই কাঁদায় নাই, পুরো বাংলাদেশের মানুষকে কাঁদিয়েছে। আর আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে অনেক কিছু, শিখিয়ে গেছে সাবধান হবার। সময় থেকে জীবনের মূল্য অনেক বেশী।

রাস্তায় চলাচল কারীদের প্রতি অনুরুধঃ

  • বেখায়ালি হয়ে রাস্তায় যাবেন না
  • রাস্তা পারাপারে ফুট ওভার ব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিং ব্যাবহার করুন
  • রাস্তায় কখনও মোবাইল ব্যাবহার করবেন না
  • ডানে বামে দেখে রাস্তা পার হওন
  • রাস্তা পারাপারে কখনও দৌড় দিবেন না
  • সমস্ত ট্রাফিক নিয়ম এবং আইন মেনে চলুন

চালকদের প্রতি অনুরুধঃ

  • আপনার সিট বেল্ট বাধা কিনা নিশ্চিত হওন
  • ড্রাইভিং এর আগে মদ, গাজা বা নেশাজাতীয় ওষুধ এড়িয়ে চলুন।
  • ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকুন, যেমন-আপনার ফোন ব্যবহার করা, যাত্রীদের সাথে কথা বলা, খাওয়া-দাওয়া।
  • রাস্তায়, আপনার ড্রাইভিং, এবং অন্যান্য রাস্তা ব্যবহারকারীদের প্রতি মনোযোগ দিন।
  • অন্য ড্রাইভার এর সাথে প্রতিযোগিতা করবেন না
  • লেনগুলি চালু বা পরিবর্তন করার আগে সর্বদা হলুদ বাতি্র সংকেত দিন
  • গতি সীমা অতিক্রম করবেন না
  • সর্বদা সতর্ক এবং সতেজ থাকুন
  • রাতের বেলা হেডলাইট ব্যবহার করুন
  • চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালাবেন না
  • সমস্ত ট্রাফিক নিয়ম এবং আইন মেনে চলুন
  • বাইকের ক্ষেত্রে অবশ্যই হেলমেট ব্যাবহার করুন

সরকারের প্রতি অনুরুধঃ

  • সড়ক দুর্ঘটনার প্রচলিত আইনের পরিবর্তন করুন
  • আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তিও নিশ্চিত করুন
  • দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণ, আহতদের পুরোপুরি চিকিৎসাব্যয় ও পঙ্গুত্ব বরণকারীদের আজীবন অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করুন
  • পর্যাপ্ত ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণ করুন বিশেষ করে যেখানে স্কুল কলেজ আছে।
  • ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করুন
  • ফিটনেস বিহীন গাড়ি বাজেয়াপ্ত করুন
  • অবৈধ পারকিং বন্ধ করুন

একার পক্ষে দুর্ঘটনা বন্ধ করা কখনই সম্ভব না, তাই আসুন আমরা সবাই মিলে সতর্ক হই এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করি। একটি দুর্ঘটনা, একটি পরিবারকে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেয়।

আবু তাহের
আউচপারা, টঙ্গি, গাজীপুর

One thought on “রোড এক্সিডেন্ট ! মৃত্যুর ফাঁদ

  1. motin19892504 says:

    NIce post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *